ঘোড়াশাল পৌরসভার ইতিহাস

পূর্বকালে ঘোড়াশাল নামে কোন গ্রাম ছিল না। তখন এ এলাকাটি চরপাড়া, টেকপাড়া, টেংগরপাড়া, বিনাটি, করতেতৈল, রাজব ও চামরাব নামে এক একটা ক্ষুদ্র পল্লী ছিল। প্রায় সাড়ে তিনশত বছর আগের কথা , দিল্লির স¤্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে টেকপাড়ায় শেখ গোলাম মোহাম্মদ নামে এক ক্ষমতাধর বিচক্ষন ব্যক্তি বাস করতেন। দিল্লির রাজ দরবারেও তাঁর নাম সুপরিচিত ছিল। ঐ সময় ঈশা খাঁর বংশধর শরিফখান শরিফপুরের জমিদার ছিলেন। শরিফ খান জমিদার হলেও একজন স্বাধীন নরপতি ছিলেন। কর পাওয়া ব্যতিত জমিদারীর অভ্যন্তরীন ব্যাপারে মোগল স¤্রাটের হস্তক্ষেপ করার তেমন কোন অধিকার ছিল না। শরিফ খানের প্রজা মোহাম্মদ রফির পুত্র জমিদার শরিফ খানের বিরুদ্ধে দিল্লির রাজ দরবারের এক গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেন। এ অভিযোগের বিচারকে কেন্দ্র করে জমিদার শরিফখানের সাথে দিল্লির রাজ দরবারের নরম বিরোধ দেখা দেয়। দিল্লির সম্্রাটের লিখিত ফরমানে শেখ গোলাম মোহাম্মদ উক্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করে দিল্লি স¤্রাটের সাথে শরিফ খানের সন্ধি করিয়ে দেন । শেখ গোলাম মোহাম্মদের এ কার্যতৎপরতা ও বিচক্ষনতায় স¤্রাট আওরঙ্গজেব ও জমিদার শরিফ খান উভয় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। এ কাজের পুরষ্কার সুরুপ স¤্রাট আওরঙ্গজেব শেখ গোলাম মোহাম্মদকে একটি তেজি ঘোড়া ও অনেক মূল্যমান একটি শাল উপহার দেন । জমিদার শরিফ খান স্বীয় পালিতা কন্যা চাঁদ বিবিকে শেখ গোলাম মোহাম্মদের দ্বিতীয় পুত্র শেখ গোলাম নবীর সহিত বিবাহ দেন এবং বিবাহের উপহার স্বরুপ চরপাড়া , টেকপাড়া, টেংগরপাড়া, বিনাটি, করতেতৈল, রাজব ও চামরাব নামে এক একটা ক্ষুদ্র পল্লীগুলো প্রদান করেন। সম্্রাট প্রদত্ত ঘোড়া আর শাল দেখার জন্য দলে দলে লোক শেখ গোলাম মোহাম্মদের বাড়িতে আসত। আগুন্তকগণকে কোথায় যাও প্রশ্ন করা হলে তারা বলতো ঘোড়া আর শাল দেখতে যাই। সেই থেকে শেখ গোলাম মোহাম্মদের বাস গ্রাম ও বিবাহের উপহার স্বরুপ প্রাপ্ত গ্রামগুলোর সমষ্টিই ঘোড়াশাল নামে পরিচিত হতে থাকে এবং তাঁর পুত্র গোলাম নবীর সময় এলাকাটি ঘোড়াশাল নামে অভিহিত হয়।

ঘোড়াশাল পৌরসভা ঢাকা হতে ৪০ কিঃ মিঃ উত্তর পূর্ব ও নরসিংদী জেলা সদর থেকে মাত্র ১২ কিঃ মিঃ উত্তর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে পলাশ উপজেলায় অবস্থিত । এটি নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার আওতাধীন ঘোড়াশাল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে ২০ শে অক্টোবর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল ইউনিয়ন (সম্পূর্ন ) এবং চরসিন্ধুর ইউনিয়নের আংশিক অংশ খানেপুর মৌজা নিয়ে ঘোড়াশাল পৌরসভা নামে ‘সি’ ক্যাটাগরীর একটি পৌরসভা গঠিত হয়। পরবর্তীতে ৫ ইং জুন, ২০০৪ সালে পৌরসভাটি ‘বি’ শ্রেনীতে উন্নীত হয় এবং পরবর্তী একই বছর ২৯ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে ঘোড়াশাল পৌরসভাটি ‘এ’ শ্রেনীতে উন্নীত হয়। প্রতিষ্ঠা পরববর্তীতে সীমানা সংক্রান্ত মামলা জনিত কারনে দীর্ঘদিন (২০.১০.১৯৯৮-১১.০৬.২০১১) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এ সময় কালে সময়ে সময়ে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সরকারী বেসরকারী প্রশাসক এবং মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত প্রশাসক সহায়তা কমিটির ১৬ জন সদস্য নিয়ে পৌরসভাটি পরিচালন করা হয়। সীমানা সংক্রান্ত মামলা নিস্পত্তি সাপেক্ষে ২০১১ সালের ১২ ইং জুন প্রথম বারের মত ঘোড়াশাল পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচন অনুষ্ঠান পরবর্তীতে গত ০৪.০৭.২০১১ তারিখে শপথ ও দায়িত্ব গ্রহনের মধ্য দিয়ে ১ম নির্বাচিত মেয়র মোঃ শরীফুল হক ঘোড়াশাল পৌর পিতা হিসেবে তার দায়িত্ব ও সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাকে ৯ টি সাধারন ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত ৯ জন কাউন্সিলর এবং ৩ টি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের নির্বাচিত ৩ জন কাউন্সিলর পৌর কর্মকান্ডে সহায়তা করছেন।

পৌরসভাটি শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় ঘোড়াশাল পৌর এলাকাটি স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র , পলাশ ইউরিয়া সারকারখানা, ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখান, বাংলাদেশ জুট মিলস, জনতা জুট মিলস্, কো- অপারেটিভ জুট মিলস্, প্রাণ গ্রুপ ইন্ডাষ্ট্রি, স্যামরি ডাইং ও পিএইচপি ইস্পাত ইত্যাদি শিল্পকারখানার অবস্থান থাকায় সমৃদ্ধ নগরায়নের বিপুল সম্ভবনা আছে। এই সম্ভাবনার আলোকে ঘোড়াশাল পৌরসভা পরিকল্পিত ভাবে নগরায়ন ও পৌরসেবা সংক্রান্ত সুবিধাদি করন সহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।